সাতক্ষীরার ঘটনার সূত্র ধরে অনলাইনে জামায়াত-শিবির কর্মী-সমর্থকদের প্রতিনিয়ত ন্যারেটিভ বদল, তথ্য বিকৃতি এবং ভিন্নমত দমনের প্রবণতা নিয়ে লেখক আসিফ আদনান একটি গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। দলীয় স্বার্থ বাঁচাতে গিয়ে কীভাবে সততা বিসর্জন দিয়ে দ্বীনের অপব্যাখ্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে—নিবন্ধটিতে সেই রাজনৈতিক ও নৈতিক বিচ্যুতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
মূল লেখা:
সাতক্ষীরার জামায়াতের এমপি-র ঘটনা নিয়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। ঘটনার রগরগে দিকটা বাদ দিয়ে আমি অন্য একটা দিকে ফোকাস করতে বলবো—জাময়াত-শিবিরের সদস্য ও সমর্থকদের অনলাইন আচরণ।
এই ঘটনার শুরুতে তারা বিষয়টাকে এআই বললো।
তারপর বললো, তাদের নেতা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে।
এখন বলছে, বিএনপি-র লোকেরা তো এসব অহরহ করে; তাদেরটা নিয়ে কিছু বলেন না, শুধু আমাদেরটাই দেখেন।
বারবার ন্যারেটিভ বদলালো, কিন্তু প্রতিবারই সেগুলো উপস্থাপন করা হলো একেবারে ১১০% কনফিডেন্স নিয়ে।
যখন এআই বলছিলো, তখন যারা সেই ন্যারেটিভ মানেনি, তাদের ব্যাপক গালাগালি করেছে।
এরপর দ্বিতীয় বিয়ের ন্যারেটিভ এলো। সেটা নিয়ে যারা সন্দেহ করেছে, তাদেরও গালাগালি করছে। এখনো করছে।
এরপর হয়তো বলবে, "এ দেশে সবাই-ই কমবেশি এমন করে, শুধু জামায়াত করলে দোষ নাকি!"—তারপর একটা গালি দিয়ে যাবে।
সেই সাথে প্রমাণের এমন এক স্ট্যান্ডার্ড দাবি করে বসবে, যা তারা নিজেরাই অন্য কারো ক্ষেত্রে মানে না। বাকি সবাই অভিযোগ আসা মাত্র দোষী; যদিও সেই অভিযোগ অনেক সময় বটবাহিনী আর গুপ্ত গ্রুপের নিজেদেরই বানানো।
আর নিজেদের ব্যাপারে সব অভিযোগই মিথ্যা। তাদের পছন্দের দলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে, সেই দলের বক্তব্য ছাড়া আর কোনো কিছুই প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। তা না হলে নাকি ‘ইনসাফ’ হবে না!
গত দু' বছর ধরে, সম্ভবত নিজেদের জোটের সদস্য ছাড়া বাকি সবার বিরুদ্ধেই এরা দেদারসে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে গেছে। বানোয়াট ফটোকার্ড, মিথ্যা অপপ্রচার, ব্যক্তি আক্রমণ, পরিবারকে আক্রমণ—কোনো কিছুই বাদ রাখেনি। ইসলামী অঙ্গনের অন্যান্য দল বা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সেক্যুলার ঘরানার লোকজন, ফেসবুকের কনটেন্ট ক্রিয়েটর; সবাই কমবেশি ভুক্তভোগী।
কোনো ক্ষেত্রেই এরা যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন মনে করেনি। সুযোগ পেলেই ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করেছে। "ডারতের দালাল", "লীগের দালাল", "খারেজি", "উগ্রবাদী", "অপরাধী", "খাট কাপানো নারী"—দেদারসে অপবাদ আর ক্যারেক্টার এসাসিনেশনের চেষ্টা চালিয়ে গেছে। আজ যখন পাশা উল্টে গেছে, তখন হাজির হয়েছে দুনিয়ার নীতিবাক্য নিয়ে।
অনলাইনে জামায়াত-শিবিরের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সত্যের ব্যাপারে এক ধরনের ভয়ঙ্কর উদাসীনতা দেখা যায়। যখন যে কথাটা প্রচার করা দরকার, সেটাই ফুল থ্রোটেডভাবে প্রচার করে। বিরোধী মতকে ভয়ঙ্করভাবে আক্রমণ করে।
তাদের নামের সাথে 'ইসলামী' শব্দটা জড়ানো, কিন্তু মিথ্যা বলতে তাদের দ্বিধা হয় না। বানোয়াট ছবি আর প্রপাগান্ডা ছড়ায়। গালাগালি করে। ওয়াটসঅ্যাপ কিংবা মেসেঞ্জার গ্রুপের মেসেজ কপি-পেইস্ট করে কমেন্ট করে বেড়ায় এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্টে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা হলো, যদি কখনো কোনো অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়া না যায়, তখন তাদের লোক, বা তাদের সাথে যুক্ত বিভিন্ন লোক, কুরআন-সুন্নাহ কিংবা ইতিহাসের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সেটাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে।
সম্ভবত কিছুদিন আগে এক শিবির নেতা এক বিবাহিত মহিলার সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে ধরা পড়েছিল। তখন তাদের সাথে যুক্ত এক ব্যক্তি ঘটনাটাকে হালকা করার চেষ্টা করেছে সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-কে এই নষ্ট আলোচনায় টেনে এনে। নাউযুবিল্লাহ।
উম্মাহর শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের ব্যাপারে কথা বলতে এদের বাঁধে না। কিন্তু তারা চায়, বাকিরা তাদের নেতাদের ব্যাপারে এমন এক স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করুক, যেটা তারা নিজেরাই আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীদের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) ব্যাপারে মেইনটেইন করে না।
এই যে দলের স্বার্থে নির্জলা মিথ্যা বলা, যখন-তখন যাকে-তাকে অপবাদ দেওয়া, ব্যক্তি আক্রমণ করা, পরিবারকে আক্রমণ করা—এসব দেখলে মনে হয়, এগুলোকে তারা দ্বীনেরই খেদমত মনে করে। এজন্যেই দলীয় ব্যক্তিদের ভুলকে ভুল বলে স্বীকার করার বদলে সেটাকে জায়েজ করার চেষ্টা করে। প্রয়োজনে তার জন্যে কুরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা করে। এমনকি জঘন্য মন্তব্য করে সাহাবায়ে কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-কে নিয়েও।
এই আচরণটার ব্যাপারে কথা বলা উচিত।
জাময়াতের একজন সংসদ সদস্য কী অপরাধ করেছেন বা করেননি, সেটার চাইতে এটা অনেক, অনেক বড় সমস্যা।
ভুল সবাই করে। কিন্তু নিজের বা নিজের দলের ভুলকে জাস্টিফাই করার জন্য যখন দ্বীন ইসলামকে বিকৃত করা শুরু হয়, তখন সেটা দ্বীনের ক্ষেত্রে ভয়ংকর বিচ্যুতির জন্ম দেয়।
ইসলামের শিক্ষা হলো, ব্যক্তির চেয়ে জামআহ বড়, জামআহর চেয়ে উম্মাহ বড়, আর সব কিছুর ওপর প্রাধান্য পাবে দ্বীন। কিন্তু জামআতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবির এটাকে উল্টে ফেলেছে।
দ্বীন, উম্মাহ—সবকিছু-র চেয়ে দল বড় হয়ে গেছে। তাই দলের স্বার্থকেই তারা উম্মাহর স্বার্থ মনে করে। দলের স্বার্থকেই দ্বীনের স্বার্থ মনে করে। তাদের সাথে কারো মতপার্থক্য হলেই তাকে ‘ইসলামের শত্রু’ আর 'ডারতের দালাল' বানিয়ে ফেলে। আর একারণেই দলের জন্য মিথ্যা বলা, সংঘবদ্ধ অপপ্রচার, গালাগালি—সবকিছু জায়েজ মনে করে। আর দলের স্বার্থটাকে তাদের জন্য ডিফাইন করে দেয় অল্প কিছু ব্যক্তি। কমপ্লিট ইনভারশান।
জাময়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের আন্তরিক সদস্য ও সমর্থক, যারা এখনো দলকে দ্বীনের ওপর স্থান দেননি, বা দুটোকে সমার্থক বানিয়ে ফেলেননি, তাদের ভাবা উচিত—যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে এ সংগঠনগুলো শুরু হয়েছিল, তার সাথে এধরনের আচরণের কী সম্পর্ক? মাওলানা মওদুদীর (রহ.) চিন্তা, লেখনী এবং ব্যক্তিত্বের সাথেও এগুলো কতোটুকু খাপ খায়। আর এভাবে তারা কিভাবে আল্লাহর নুসরত আশা করতে পারেন।
