সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আলোচনায় একটি দাবি উঠতে দেখা যায়— “রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জামানায় কোনো মাদ্রাসা ছিল না, সাহাবীরাও মাদ্রাসায় পড়েননি।”
বাহ্যিক দৃষ্টিতে নির্দিষ্ট একটি 'ভবন' বা আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দিক থেকে কথাটি সত্য মনে হলেও, মূল চেতনা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পাঠদান পদ্ধতির দিক থেকে এটি একটি অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর দাবি। কালের আবর্তনে নাম ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিবর্তিত হলেও দ্বীনি শিক্ষার মূল ধারা ও ধারাবাহিকতা নবুওয়াতের জামানা থেকেই অব্যাহত রয়েছে।
১. 'মাদ্রাসা' শব্দের শাব্দিক ও প্রায়োগিক অর্থ:
‘মাদ্রাসা’ (مدرسة) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ 'পড়াশোনা করার স্থান' বা শিক্ষালয়। আরবি ভাষাভাষী দেশগুলোতে যেকোনো সাধারণ বিদ্যালয় বা স্কুলকেই ‘মাদ্রাসা’ বলা হয়ে থাকে। আর উপমহাদেশের পরিভাষায় দ্বীনি ও ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে 'মাদ্রাসা' হিসেবে অভিহিত করা হয়। সুতরাং কেবল 'মাদ্রাসা' নামের আধুনিক একটি ভবন বা নামফলক নববী যুগে ছিল না বলেই সে যুগে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল না—এমন দাবি করা যৌক্তিক নয়।
২. আসহাবুস সুফ্ফাহ: সুসংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক সূচনা-
মহানবী (সা.)-এর যুগে আনুষ্ঠানিকভাবে ইটের দেয়ালঘেরা আধুনিক মাদ্রাসার ভবন না থাকলেও দ্বীনি শিক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট কেন্দ্র ও ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই বিদ্যমান ছিল। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ— 'আসহাবুস সুফ্ফাহ' বা 'সুফ্ফার অধিবাসীগণ'।
মসজিদে নববীর একপাশে একটি নির্দিষ্ট চত্বর বা বারান্দা ছিল, যা 'সুফ্ফাহ' নামে পরিচিত। সেখানে বহু সাহাবী অবস্থান করতেন, যাদের মূল কাজই ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে সরাসরি কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা গ্রহণ করা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-সহ অনেক শীর্ষস্থানীয় সাহাবী এই ব্যবস্থার অধীনে শিক্ষা লাভ করেছেন। এটি ছিল মূলত ইসলামী ইতিহাসের প্রথম আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র বা মাদ্রাসার আদি রূপ।
৩. শিক্ষাপদ্ধতি ও নববী আদর্শ:
নবুওয়াতের যুগে যেভাবে ইলম বা জ্ঞান চর্চা হতো, বর্তমান মাদ্রাসাগুলোতে সেই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়:
কোরআন তেলাওয়াত ও হিফজ: মহানবী (সা.) স্বয়ং জিবরাইল (আ.)-কে প্রতি রমজানে পুরো কোরআন শোনাতেন এবং সাহাবীদের কোরআন শিক্ষা দিতেন। বর্তমান হিফজখানাগুলোতে একই নিয়মে ছাত্ররা উস্তাদকে কোরআন মুখস্থ শুনিয়ে থাকে।
হাদিসের দরস ও সনদ ব্যবস্থা: সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর মুখে হাদিস শুনতেন, তা মুখস্থ করতেন এবং লিখে রাখতেন। পরবর্তীতে তা তাবেয়ী ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেন। বর্তমান মাদ্রাসাগুলোতেও এই ঐতিহ্যবাহী ‘দরস’ ও পঠন-পাঠন ব্যবস্থা হুবহু জারি রয়েছে।
৪. যুগোপযোগী পরিবর্তন ও আধুনিক কাঠামোর প্রয়োজন-
কালের পরিক্রমায় সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষাব্যবস্থাতেও কিছু বাহ্যিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে:
আবাসিক ব্যবস্থা: তৎকালীন সময়ে অধিকাংশ সাহাবী স্থানীয় হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিরাট আবাসিক ভবনের প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এবং সার্বক্ষণিক দ্বীনি পরিবেশে রাখার উদ্দেশ্যে আবাসিক ব্যবস্থার সংযোজন করা হয়েছে।
পাঠ্যসূচি (নেসাব): আরবদের মাতৃভাষা আরবি হওয়ায় তৎকালীন সময়ে ভাষা শেখার আলাদা প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু অনারব দেশগুলোতে (যেমন ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান) দ্বীন ও শরীয়াহ সঠিকভাবে বোঝার জন্য আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, ফিকহ (ইসলামী আইন) ও যুক্তিশাস্ত্রের মতো বিভিন্ন বিষয় পাঠ্যসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে।
নামকরণ: ভারতীয় উপমহাদেশে এই ধারাবাহিক দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘কওমি মাদ্রাসা’ বা দ্বীনি মাদ্রাসা নামে রূপ দেওয়া হয়েছে, যা জনগণের অনুদানে পরিচালিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে।
উপসংহার:
অতএব, মূল বিষয় হলো— নাম এবং বাহ্যিক কাঠামোর পার্থক্য থাকলেও চেতনা, লক্ষ্য এবং শিক্ষাপদ্ধতির দিক থেকে বর্তমানের দ্বীনি মাদ্রাসাগুলো মূলত নববী জামানার সেই দ্বীনি তালিম ও আসহাবুস সুফ্ফার শিক্ষাব্যবস্থারই ধারাবাহিক রূপ। কোনো বিষয়ের গভীর ইতিহাস ও স্বরূপ না জেনে কেবল বাহ্যিক নাম দেখে মন্তব্য করা অনুচিত। গঠনমূলক তথ্য যাচাই ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমেই কেবল সত্যে উপনীত হওয়া সম্ভব।
